সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, , ১০ জ্বিলহজ্ব ১৪৪৫

জাতীয় কবির ১২৫তম জন্মবার্ষিকী আজ

আমারে দেবো না ভুলিতে…

আমারে দেবো না ভুলিতে…
ছবি- সংগৃহীত

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ, ২৫ মে; বাংলা সাহিত্যে সাম্য, প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৯৯ সালের এই দিনে এমনই এক আগুনঝরা সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল। বাংলা সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে যখন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবল প্রভাব, সে সময়ও স্বতন্ত্র ভাষাশৈলী আর গানে-কবিতায় একদিকে তুমুল বিদ্রোহ, অন্যদিকে প্রেমের ঝান্ডা নজরুল হয়ে উঠেছিলেন বিশ শতকের অন্যতম প্রধান বাঙালি কবিদের একজন। মূলত প্রতিবাদের ভাষা গান, কবিতা, গল্পে ছড়িয়ে দিয়ে নজরুলের নামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তাই ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

নজরুলের বাবা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন মসজিদের ইমাম, মা জাহেদা খাতুন গৃহিণী। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত নজরুলের ছেলেবেলার ডাক নাম দুখু মিয়া। যৌবনে শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে চালিয়েছেন সংগ্রাম। নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে ধরেছেন লেখনী। কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে থেকেছেন আপসহীন। বাংলা সংগীতে সৃষ্টি করেছেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রধারা। নজরুলের হাত ধরেই প্রবর্তিত হয়েছে বাংলা গজল। সব্যসাচীর মতো আরেক হাতে লিখেছেন শ্যামাসংগীতও। সব মিলে নজরুল ছিলেন কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, শিশু সাহিত্যিক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার, স্বরলিপিকার, গীতিনাট্যকার, গীতালেখ্য রচয়িতা, চলচ্চিত্র কাহিনিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, সংগীত পরিচালক, গায়ক, বাদক, সংগীতজ্ঞ ও অভিনেতা। 

নজরুল বিদ্রোহী কবি হলেও তাঁর প্রেমিক রূপ ছিল সুবিদিত। তাঁর এ প্রেম প্রকাশ পেয়েছে কখনও নারীর প্রতি, আবার কখনও স্রষ্টার, প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের প্রতি। এখনও চীর রোমান্টিক নজরুলের গান নানা অনুভূতিতে ঝড় তোলে প্রেমিক মনে। সেজন্যই বোধহয় কবি লিখেছেন, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেবো না ভুলিতে/ আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ/ বেণী যাবে যবে খুলিতে’। 
নজরুল ইসলাম লিখে গেছেন ২২টি কাব্যগ্রন্থ, সাড়ে ৩ হাজার মতান্তরে ৭ হাজার গানসংবলিত ১৪টি সংগীতগ্রন্থ, তিনটি কাব্যানুবাদ ও তিনটি উপন্যাস, তিনটি নাটক, তিনটি গল্পগ্রন্থ, পাঁচটি প্রবন্ধ, দুটি কিশোর নাটিকা, দুটি কিশোর কাব্য, সাতটি চলচ্চিত্র কাহিনিসহ অসংখ্য কালজয়ী রচনা।

নজরুল ইসলাম ১৯৪১ সালের শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসা চলে কলকাতায়। ১৯৫৩ সালে ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পাঠানো হয় তাঁকে। এ সময়ে একেবারেই বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন নজরুল। ফলে ১৯৫৩ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অসুস্থাবস্থায় নীরবে-নিভৃতেই কাটে তাঁর জীবন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২৫ মে নজরুল ইসলামের জন্মদিনে তাঁকে ঢাকায় এনে জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কবির লেখা ‘চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ গানটিকে সামরিক সংগীত হিসেবে নির্বাচিত করে তাঁকে সম্মানিত করা হয়।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হন মহান কবি নজরুল। মৃত্যুর পর কবির ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। 

কর্মসূচি: জাতীয় পর্যায়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উদযাপনে নানা কর্মসূচি উদযাপিত হচ্ছে আজ। নজরুলের লেখা গল্প-কবিতা ও নাটকের ওপর ভিত্তি করে নানা অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারসহ বেসরকারি বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। কবির স্মৃতিধন্য ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুরে রয়েছে তিন দিনব্যাপী নানা আয়োজন। সেখানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হবে। এছাড়া ঢাকায় এবং কবির স্মৃতিবিজড়িত কুমিল্লার দৌলতপুরসহ বিভিন্ন স্থানে রয়েছে একাধিক আয়োজন। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে আজ সকাল ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে একাডেমির নজরুল মঞ্চে স্থাপিত নজরুল প্রতিকৃতিতেও। আজ দিনভর বাংলা একাডেমি একক বক্তৃতা, নজরুল পুরস্কার প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এছাড়া আরও সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপন করবে।