রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, , ১৮ জ্বিলক্বদ ১৪৪৫

প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচন কী বার্তা দিলো?

প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচন কী বার্তা দিলো?

উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপে ১৩৯টি উপজেলায় ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হলো। ১৫২টি উপজেলায় নির্বাচনের তপশিল ঘোষিত হলেও কয়েকটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী জয়ী হয়েছেন; কয়েকটিতে মামলাসহ নানা কারণে ভোট স্থগিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাধারণত যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়, এবারের উপজেলা নির্বাচনে তা দেখা যায়নি।

বেশির ভাগ উপজেলায় প্রচার-প্রচারণা ছিল প্রায় নিষ্প্রভ; ভোটের হারেও যার ধারাবাহিকতা লক্ষণীয়। ইসি বা নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাব অনুসারে, গড় ভোটের হার ছিল ৩০-৪০ শতাংশ। বলা যায়, উপজেলা নির্বাচনে প্রথম ধাপে ভালো কোনো বার্তা এলো না। ভোটার খরা মূলত শুরু হয়েছিল পঞ্চম উপজেলা নির্বাচন থেকেই। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ওই উপজেলা নির্বাচনে ইসির হিসাবমতেই ভোটার উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ৪০ শতাংশের কিছু বেশি, বাস্তবে যা আরও কম ছিল বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। অথচ ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনেও ভোটের হার ছিল ৬১ শতাংশ এবং ২০০৯ সালের তৃতীয় উপজেলা ভোটে প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট পড়ে।

অনেকের ধারণা, ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ২০১৯ সালের পঞ্চম উপজেলা নির্বাচন বিএনপি ও তার মিত্ররা বর্জন করায় তখন ভোটের হারে এমন ধস নামে। একই মতের মানুষেরা এবারের নিম্নহারের ভোটের জন্যও বিএনপিসহ প্রায় সব বিরোধী দলের ভোট বর্জনকে দায়ী করছেন। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার উৎখাতে ‘দৃঢ়সংকল্প’ বিএনপি ও অন্য বিরোধী দলগুলো গত ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় দলগুলো চলমান উপজেলা নির্বাচনও বর্জন করছে। বিএনপি ক্ষমতাসীন দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, যার পেছনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটারের সমর্থন আছে– এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। অতএব, চলমান নির্বাচনে দৃষ্টিকটু ভোটার অনুপস্থিতির সঙ্গে বিএনপির ভোট বর্জনের সংশ্লিষ্টতা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কম। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করেছিল। তবে এর পরপর অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে দলটি অংশগ্রহণ করে; যেমনটা ওপরে বলা হয়েছে, তাতে ভোটার উপস্থিতিও ছিল প্রায় স্বাভাবিক।

অবশ্য দল ভোট বর্জন করলেও এবারের উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিএনপি নেতার সংখ্যা বেশ চোখে পড়ার মতো। বিএনপির দপ্তর থেকে পরিবেশিত তথ্য উদ্ধৃত করে বুধবার বাংলা দৈনিক মানবজমিন যা লিখেছে তাতে স্পষ্ট, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রথম দু’ধাপে ১৪২ জন নেতা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন, যদিও তাদের সবাইকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই এ বিষয়কে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এমনও বলা হচ্ছে, এর ফলে বিএনপির অব্যাহত নির্বাচন বর্জন নীতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তবে প্রথম ধাপে ভোটের নিম্নহারের পাশাপাশি যে মাত্রায় মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের এমপির প্রভাব দেখা গেছে, তাতে বিএনপি নেতৃত্বের পক্ষে ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা অনেকাংশেই সহজ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

আমরা দেখেছি, প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে আওয়ামী লীগ দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী বিপুলসংখ্যক নেতাকে স্বতন্ত্র নির্বাচনে উৎসাহ দেয়। নজিরবিহীন এ কৌশল মাঠ পর্যায়ে পরিষ্কার হতে যথেষ্ট দেরি হওয়ার পরও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বেশ। বলা যায়, নির্বাচন ঘিরে সরকারের ওপর যে প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, অন্তত তা অনেকটাই কমে যায় ওই কৌশলের কারণে।

একই কৌশল চলমান উপজেলা নির্বাচনেও গ্রহণ করে ক্ষমতাসীন দল। দলীয় মনোনয়ন বন্ধের পাশাপাশি নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থিতাকে উৎসাহ দেওয়া হয়। শুরুর দিকে কৌশলটি বেশ কার্যকর বলেও মনে হচ্ছিল, বিশেষত দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে বিএনপির বহু নেতা নির্বাচনের মাঠে নামায়। কিন্তু সকলই গরল ভেল হয়ে যায় যখন মন্ত্রী-এমপিরা রীতিমতো আটঘাট বেঁধে স্বীয় প্রভাব বলয়ভুক্ত প্রার্থীদের নিয়ে মাঠে নেমে যান। তাদের অনেকে এমনকি পরিবারের সদস্য বা অন্য কোনো স্বজনকেও নির্বাচনে নামিয়ে দেন। সরকারি দলের শীর্ষ মহল দফায় দফায় নির্দেশনা দিয়েও মন্ত্রী-এমপির স্বজনদের এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। নির্বাচনে যে কোনো উপায়ে প্রভাব বিস্তার থেকে ক্ষমতাসীন দলীয় নেতাদের বিরত থাকার শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনাও উপেক্ষিত হয়।

এত কিছুর পরও শেষ রক্ষা হতো যদি নির্বাচনে মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকত। এ ব্যাপারে ইসির পক্ষ থেকে নির্দেশনা থাকলেও সরকারের মনোভাব অস্পষ্টই রয়ে যায়। নেতৃবৃন্দ নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার পক্ষে কিছু সতর্কতা জারি করেই দায়িত্ব শেষ করতে চেয়েছেন বলে মনে হয়। অথচ এটা ওপেন সিক্রেট, সরকারদলীয় স্থানীয় এমপির সংকেত ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নড়াচড়া করে না। এমনকি থানাও মামলা নেয় না। ফলে সরকারি দলের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিছক মুখের কথায় নির্বাচনী মাঠ সবার জন্য সমতল হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। গতকালের নির্বাচনে সেটাই দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের একাধিক বিএনপি নেতা এ বক্তব্য দিয়েছেন, সরকারি দল দলীয় প্রতীক না দেওয়ায় তাদের কাছে মনে হয়েছে, নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে। তাই তারা দলের নিষেধ সত্ত্বেও এতে অংশ নিয়েছেন; কিন্তু বাস্তবে মাঠে নেমে তারা উল্টো চিত্রই দেখেছেন। তাই তাদের অনেকেই নামকাওয়াস্তে প্রার্থিতা রেখেছেন। এ অবস্থা যে শুধু সাধারণ নয়; দলীয় ভোটারদেরও উৎসাহে পানি ঢেলে দেয়, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না। পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও অনিয়ম নিয়ে সরকারি দলের শরিক দলের নেতারাও জাতীয় সংসদে সোচ্চার হয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক, তাতে সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা কর্ণপাত করেছেন, এমনটা বলা যায় না। এটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার এ গুরুত্বপূর্ণ স্তরের কার্যকরতার জন্য তো বটেই, সামগ্রিকভাবে উন্নয়নের জন্যও শুভ নয়। ভোটে যদি ভোটাররাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে প্রশাসন ন্যূনতম জবাবদিহিহীন হয়ে পড়ে, যা সর্বস্তরে স্বেচ্ছাচারিতার জন্ম দেয়; গণতন্ত্রকে সুদূরপরাহত করে ছাড়ে। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান’ করার যে নির্দেশনা আছে, এ পরিস্থিতিতে তাও কথার কথায় পরিণত হয়। এখনও যদি সরকার অন্তত মুখে যা বলছে, কাজেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়, তাহলে বাকি ধাপগুলোতে হয়তো একটু ভিন্ন চিত্র মিলতে পারে। সংবিধান ও গণতন্ত্র বাঁচাতে সে পথে সরকার হাঁটুক– এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের। বিশ্লেষক: সাইফুর রহমান তপন- সহকারী সম্পাদক,দৈনিক সমকাল